এস.এস.সি অথবা এইচ.এস.সি তে বোর্ডের বাংলা বই-এ “পাঠকের মৃত্যু” নামের একটা গল্প ছিলো, লেখক ছিলেন মনে হয় বনফুল। গল্পটার মূল বিষয় ছিলো – শৈশবে লেখক একটা বেশ মজার বই পড়েছিলেন। বহুদিন পর কোন এক উপলক্ষ্যে লেখক আবারও সেই বইটি পড়ার সুযোগ পান। কিন্তু কিছুক্ষণ পড়ার পর লেখক আর পড়ার আগ্রহ পান না, তাঁর কাছে বইটি আর আগের মত আকর্ষণীয় মনে হয়নি। শেষ পর্যন্ত লেখক উপসংহারে পৌছান যে সময়ের আবর্তনে তাঁর ভিতর যে পাঠক ছিলো তার পরিবর্তন ঘটেছে আর শৈশবের সেই “পাঠকের মৃত্যু” ঘটেছে।
বিখ্যাত টেনিদা’র স্রষ্টা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের “সেই বইটি” নামে একটা গল্প পড়লাম আজকে। এই গল্পটাও অনেকটা “পাঠকের মৃত্যু”-র মত। কিন্তু বিশাল পার্থক্য আছে, কিরকম? – নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এই গল্পে পাঠকের মৃত্যু ঘটান না, বরং তাকে বাঁচিয়ে রাখেন। লেখক এক প্রকাশকের দোকানে বসে ছিলেন আর অন্যমনস্কভাবে বিভিন্ন বই নাড়াচাড়া করছিলেন। এইসময় “গহন বনের গল্প” নামের একটা বই-এর উপর তাঁর নজর পড়ে। লেখক বইটি সংগ্রহ করে পার্কে গিয় বসেন। তারপর বইটি পড়া বাদ দিয়ে তিনি স্মৃতি রোমন্থন করা শুরু করেন। শৈশবের কোন একদিনে স্কুলের এক সহপাঠীর হাতে এই বইটি দেখে তার খুব পড়ার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পরও তিনি বইটি জোগাড় করতে ব্যর্থ হন, সেইসময় বইটা কিনে পড়ার মত সামর্থ্যও লেখকের ছিলো না। তাই শেষ পর্যন্ত “গহন বনের গল্প” লেখকের আর পড়া হলো না। আজ এতদিন পর বইটি লেখক হাতে পেয়েছেন, লেখক অনেক খুশি। “পাঠকের মৃত্যু”-র পাঠকের মত কিন্তু “সেই বইটি”র লেখক বইটি খুলে পড়া শুরু করলেন না। তিনি বইটাকে তাঁর বিশাল লাইব্রেরির অজস্র বই-এর ভিতর লুকিয়ে রাখলেন। তাঁর ভয় ছিলো যদি বইটা এখন আর ভালো না লাগে, যদি শৈশবের মনটা এরই ভিতর বদলে গিয়ে থাকে।
এই গল্প দুইটার মত পরিস্থিততে নিজের জীবনেও বেশ কয়েকবার পড়েছি। ছেলেবেলাতে তিন গোয়েন্দা, কিশোর থ্রিলার বা অন্য কোন শিশুতোষ বই বেশ মজা নিয়ে পড়েছি, তখন সেগুলো ছিলো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কতদিন মায়ের টাকার ব্যাগ নাহলে বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করে, হেঁটে স্কুল থেকে বাসাতে এসে রিক্সাভাড়া বাঁচিয়ে বইগুলো কিনতাম। বন্ধুদের সাথে লেনদেন করেও কত বই পড়েছি। সেইসময় প্রায় ২০০-৩০০ বই জমে গিয়েছিলো। কত মজার, কত আকর্ষণীয় ছিলো বইগুলো সে সময়ে। কিশোর-মুসা-রবিন তাদের দুর্দান্ত কর্মকান্ড দিয়ে আমার স্মৃতিতে শৈশবের ‘হিরো’ হয়েই ছিলো। কিন্তু কয়েকবছর আগে পুরনো জিনিসপত্র পরিস্কার করতে গিয়ে হাতে পড়লো একটা বই(নামটাও মনে করতে পারছি না!), আর “পাঠকের মৃত্যু”র পাঠকের মত আগ্রহের সাথে পড়া শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যে আগ্রহ উবে গেলো। অবাক হলাম এই বই এত মজা নিয়ে পড়ার কি আছে!?!? আজকে “সেই বইটি” পড়ার পর মনে হলো ঐসময় হাতে পেয়ে বইটা না পড়লেই বরং ভালো করতাম। আফসোস!!!